সড়ক আইন সহজ গাইড

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহণ আইন — সহজ ভাষায়

সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮ এবং সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন থেকে গুরুত্বপূর্ণ নিয়মগুলো সহজ করে সাজানো হয়েছে। প্রতিটি অংশের নিচে মূল সরকারি সোর্সের লিংক দেওয়া আছে।

ধারা ১৬

১. মোটরযান রেজিস্ট্রেশন

রেজিস্ট্রেশন সনদ ছাড়া সড়ক, মহাসড়ক বা যেকোনো পাবলিক প্লেসে কোনো মোটরযান চালানো বা চালানোর অনুমতি দেওয়া যাবে না।

  • রেজিস্ট্রেশনের জন্য নির্ধারিত ফরম, ফি ও পদ্ধতিতে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে।
  • রেজিস্ট্রেশন নম্বরপ্লেট গাড়িতে লাগানো ও দৃশ্যমান রাখা বাধ্যতামূলক।
  • প্রাইম মুভার ও ট্রেইলারের জন্য আলাদা আলাদা রেজিস্ট্রেশন ও নম্বরপ্লেট লাগবে (আর্টিকুলেটেড গাড়ির সাথে যুক্ত সেমি-ট্রেইলার ব্যতিক্রম)।
  • প্রতিরক্ষা বাহিনীর গাড়ি নিজস্ব পদ্ধতিতে রেজিস্ট্রেশন হবে, তবে ব্যক্তিগত/বাণিজ্যিক ব্যবহারের গাড়ি এর বাইরে।
⚠️
না মানলে: সর্বোচ্চ ৬ মাস কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা জরিমানা, বা উভয়ই (ধারা ৭২)।
ধারা ১৮

২. অস্থায়ী রেজিস্ট্রেশন

গাড়ির মালিক বা প্রতিষ্ঠান চাইলে নির্ধারিত ফি দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অস্থায়ী রেজিস্ট্রেশনের জন্য আবেদন করতে পারবে। এর আবেদন পদ্ধতি, ফরম, ফি, মঞ্জুর/প্রত্যাখ্যান ও মেয়াদ বিধিমালা দ্বারা নির্ধারিত হয়।

ধারা ২০

৩. মোটরযান প্রদর্শন

নিচের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সামনে গাড়ি সরাসরি প্রদর্শন (হাজির) করতে হবে:

  • রেজিস্ট্রেশনের সময়
  • মালিকানা পরিবর্তন রেকর্ড করার সময়
  • গাড়ির কারিগরি, অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক কোনো পরিবর্তনের সময়
  • ফিটনেস সনদ নেওয়ার সময়
গাড়ি প্রদর্শন না করলে কর্তৃপক্ষ রেজিস্ট্রেশন, মালিকানা পরিবর্তন বা কারিগরি পরিবর্তনের কাজ করতে অস্বীকার করতে পারবে।
ধারা ২৬

৪. ট্যাক্স টোকেন

বৈধ ট্যাক্স টোকেন ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ ট্যাক্স টোকেন দিয়ে কোনো গাড়ি চালানো বা চালাতে দেওয়া যাবে না (আইন অনুযায়ী অব্যাহতিপ্রাপ্ত গাড়ি ব্যতীত)। মালিক বা প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত সড়ক কর নিয়মিত পরিশোধ করতে হবে।

⚠️
না মানলে: সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা জরিমানা (ধারা ৭৬)।
প্রজ্ঞাপন

৫. ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স

বিআরটিএ QR কোডসহ ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স দিচ্ছে। চালকরা স্মার্ট কার্ডের মতোই স্মার্টফোনে ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখিয়ে গাড়ি চালাতে পারবেন।

  • ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ড ও ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স — দুটোই সমান গ্রহণযোগ্য (ভিসা প্রসেসিং, বিদেশে ব্যবহার, চাকরিতে নিয়োগ ইত্যাদি ক্ষেত্রেও)।
  • QR কোড স্ক্যান করে সরাসরি ডাটাবেজ থেকে লাইসেন্সের তথ্য যাচাই করা যায়।
নির্দেশিকা ২০২৪

৬. মোটরযানের গতিসীমা

সড়ক/মহাসড়কের শ্রেণি ও গাড়ির ধরন অনুযায়ী সর্বোচ্চ গতিসীমা (কিমি/ঘণ্টা):

সড়কের শ্রেণি কার/জিপ/
মাইক্রোবাস
বাস-মিনিবাস ট্রাক/
কাভার্ডভ্যান
মোটরসাইকেল ট্রেইলারযুক্ত
আর্টিকুলেটেড
থ্রি-হুইলার
এক্সপ্রেসওয়ে৮০৮০৬০৬০৫০নিষিদ্ধ
জাতীয় মহাসড়ক (ক্যাটাগরি-এ)৮০৮০৬০৫০৫০নিষিদ্ধ
জাতীয় মহাসড়ক (বি) ও আঞ্চলিক মহাসড়ক৭০৭০৪৫৫০৪৫নিষিদ্ধ
জেলা সড়ক৬০৬০৪০৫০৪০অনুমতি সাপেক্ষে ৩০
সিটি/পৌরসভা/জেলা সদরের ভেতরের জাতীয়-আঞ্চলিক মহাসড়ক৪০৪০৩০৩০৩০অনুমতি সাপেক্ষে ৩০
সিটি/পৌরসভা/জেলা সদরের অভ্যন্তরীণ সড়ক৪০৪০৩০৩০—অনুমতি সাপেক্ষে ৩০
উপজেলা মহাসড়ক৪০৪০৩০৩০৩০অনুমতি সাপেক্ষে ৩০
শহর এলাকায় প্রাইমারি আরবান সড়ক৪০——৩০—অনুমতি সাপেক্ষে ৩০
শহর এলাকায় সংকীর্ণ/শেয়ার রোড৩০—৩০২০—অনুমতি সাপেক্ষে ২০
গ্রামীণ সড়ক৩০——৩০—৩০
শিক্ষা/ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, হাট-বাজার এলাকায়স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ভিন্ন (কম) গতিসীমা ঠিক করতে পারবে, তবে জাতীয় মহাসড়কে ৪০ ও আঞ্চলিক মহাসড়কে ৩০ কিমি/ঘণ্টার বেশি নয়।
দুর্যোগ বা কম দৃষ্টিসীমায়খারাপ আবহাওয়া, বৃষ্টি, কুয়াশায় নিরাপদ গতি মেনে চলতে হবে; দৃষ্টিসীমা একেবারে কমে গেলে গাড়ি থামিয়ে রাখতে হবে।
জরুরি সেবার গাড়িঅ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ইত্যাদির ক্ষেত্রে গতিসীমার শর্ত শিথিলযোগ্য।
ওভারটেকশুধু ডান লেন দিয়ে, সামনে-পেছনে যথেষ্ট নিরাপদ জায়গা থাকলেই ওভারটেক করা যাবে। বাম লেন দিয়ে ওভারটেক নিষিদ্ধ।
এই গতিসীমা অমান্য করলে সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ধারা ১০৯ধারা ১১১

৭. পুলিশের ক্ষমতা

গাড়ি থামানো ও কাগজপত্র পরীক্ষা (ধারা ১০৯): সাব-ইন্সপেক্টর বা সার্জেন্ট পদমর্যাদার নিচে নয় এমন পুলিশ অফিসার, বা কর্তৃপক্ষের ক্ষমতাপ্রাপ্ত মোটরযান পরিদর্শক চাইলে চালক গাড়ি থামিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে বাধ্য থাকবেন।

জাল কাগজপত্র আটক (ধারা ১১১): লাইসেন্স, পারমিট, রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস বা বীমা সনদ জাল বা মিথ্যা মনে হলে তা আটক করে চালক বা মালিককে কৈফিয়তের জন্য তলব করা যাবে।

  • চালক/কন্ডাক্টর পালিয়ে যাওয়ার বা সমন এড়ানোর আশঙ্কা থাকলে লাইসেন্স আটক করে আদালতে পাঠানো হবে।
  • আদালতে প্রথম হাজিরাতেই সাময়িক প্রাপ্তিস্বীকারপত্রের বিনিময়ে লাইসেন্স ফেরত দেওয়া হবে।
  • লাইসেন্স জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকারপত্র থাকলে ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত (বা তাতে লেখা তারিখ পর্যন্ত) গাড়ি চালানো/কন্ডাক্টরের দায়িত্ব পালন করা যাবে।
একাদশ অধ্যায়

৮. শাস্তি ও জরিমানা সারসংক্ষেপ

নিচের টেবিলে "ধারা" কলামের সংখ্যায় ক্লিক করলে মূল আইনের টেক্সট দেখতে পাবেন।

লঙ্ঘনধারাশাস্তি
ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান চালানো (ধারা ৪, ৫)৬৬৬ মাস কারাদণ্ড / ২৫,০০০ টাকা জরিমানা / উভয়
রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি চালানো৭২৬ মাস কারাদণ্ড / ৫০,০০০ টাকা জরিমানা / উভয়
ট্যাক্স টোকেন ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ টোকেনে চালানো৭৬সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা জরিমানা
সাধারণ নির্দেশাবলির প্রথম অংশ লঙ্ঘন — যেমন হেলমেট/ফুটপাত (ধারা ৪৯(১))৯২(১)৩ মাস কারাদণ্ড / ১০,০০০ টাকা / উভয় + ১ পয়েন্ট কর্তন
সাধারণ নির্দেশাবলির দ্বিতীয় অংশ লঙ্ঘন — যেমন মোবাইল ফোন (ধারা ৪৯(১))৯২(২)১ মাস কারাদণ্ড / ৫,০০০ টাকা / উভয় + ১ পয়েন্ট কর্তন
আক্রমণাত্মক আচরণ / জনরোষ সৃষ্টি (ধারা ১১৯)১০৩১ মাস কারাদণ্ড / ১০,০০০ টাকা জরিমানা / উভয়
ধারা ৪ধারা ৪৯

৯. মোটরসাইকেলের বিশেষ নিয়ম

১. হেলমেট ও সহযাত্রী সীমা: চালক ছাড়া মোটরসাইকেলে একজনের বেশি সহযাত্রী (পিলিয়ন) বহন করা যাবে না — অর্থাৎ সর্বোচ্চ ২ জন উঠতে পারবেন। চালক ও সহযাত্রী উভয়কেই সঠিকভাবে হেলমেট পরতে হবে।

⚠️
না মানলে (৩ জন ওঠা বা হেলমেট না পরা): সর্বোচ্চ ৩ মাস কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা জরিমানা, বা উভয়ই + লাইসেন্স থেকে ১ পয়েন্ট কর্তন (ধারা ৯২(১))।

২. ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানো নিষেধ: সড়কের পাশের ফুটপাতের উপর দিয়ে কোনো মোটরযান (মোটরসাইকেলসহ) চালানো যাবে না।

⚠️
না মানলে: সর্বোচ্চ ৩ মাস কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা জরিমানা, বা উভয়ই + ১ পয়েন্ট কর্তন (ধারা ৯২(১))।

৩. চালনারত অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষেধ: মোটরসাইকেল চালানোর সময় মোবাইল ফোন বা এ ধরনের কোনো সরঞ্জাম ব্যবহার করা যাবে না।

⚠️
না মানলে: সর্বোচ্চ ১ মাস কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা জরিমানা, বা উভয়ই + ১ পয়েন্ট কর্তন (ধারা ৯২(২))।

৪. বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স আবশ্যক: ড্রাইভিং লাইসেন্স বা শিক্ষানবিশ লাইসেন্স ছাড়া, বা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স দিয়ে, পাবলিক প্লেসে মোটরসাইকেল চালানো বা চালাতে দেওয়া যাবে না। এছাড়া লাইসেন্সে উল্লেখিত শ্রেণির (ক্যাটাগরি) বাইরের মোটরযান চালানোও নিষেধ।

⚠️
না মানলে: সর্বোচ্চ ৬ মাস কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা জরিমানা, বা উভয়ই (ধারা ৬৬)।
বিআরটিএ বর্তমানে মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রেও বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক করেছে — লাইসেন্স ছাড়া নতুন মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন করা যায় না।

৫. গতিসীমা: মোটরসাইকেলের জন্য সড়ক/মহাসড়কভেদে সর্বোচ্চ গতিসীমা ২০–৬০ কিমি/ঘণ্টা পর্যন্ত (বিস্তারিত টেবিল উপরে, "৬. মোটরযানের গতিসীমা" অংশে দেখুন)। নির্ধারিত গতিসীমা ছাড়িয়ে বেপরোয়াভাবে চালালে সংশ্লিষ্ট ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।